মেহনতি মানুষের দৈনিক

আজ ,

লক্ষ্মীপুর থেকে প্রকাশিত ।। রেজি: নং : চ- ৬৩৯/১২।।

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস

বিশেষ প্রতিনিধি : সময় বদলে যাওয়ার সাথে সাথে বদলাচ্ছে মানুষের সাধারণ জীবন-যাপন প্রণালী। হারিয়ে যাচ্ছে দেশের প্রচলিত সংস্কৃতি। অপসংস্কৃতির কাছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এখন জিম্মি। গ্রামের একটি প্রবাদ ‘আমরা ভাত-মাছে বাঙালী’। এক সময় এটাই বাঙালী জাতির বড় পরিচয় বলে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিতো।

সে সময়ে ছিলো বাংলার নানা ঐতিহ্য, যেগুলো আমাদের গ্রামবাংলাকে করেছিলো সমৃদ্ধ। কালের বিবর্তনের সাথে সাথে এখন গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। এক সময় গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ আর গোলা ভরা ধান ছিল। এসব কিছু হারিয়ে আজ শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।

এমনই এক ঐতিহ্যবাহী পণ্য ছিলো খেজুর গাছের রস ও খেজুরের মিঠাই (গুড়)। লক্ষ্মীপুর জেলায় এমন কোনো বাড়ি বা রাস্তা ছিলো না যেখানে অন্ততঃ দু’-একটি খেজুর গাছ ছিলো না। বাংলা পুঞ্জিকা অনুযায়ী কার্তিক মাস থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত প্রতি বাড়ির দু’-একজন মধ্য বয়সী বাপ-চাচা খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। যারা খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করতো। স্থানীয়ভাবে গ্রাম্যভাষায় তাদেরকে ‘গাছি’ বলা হতো।

গাছিরা দিনের বেলার মধ্যভাগ থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধারালো একটি চেনি (দা) মুগুর আর রস সংগ্রহরে হাঁড়ি পিঠের পিছনে একটি লম্বা ঝুড়িতে বেঁধে এ বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি বয়ে নিয়ে যেতো খেজুর গাছ কাটার জন্য। এ কাজে গাছিদেরকে বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েরা সাহায্য করতো পিছনে পিছনে হাড়ি বহন করে। আবার খুব ভোর থেকে গাছিরা বিভিন্ন গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে খেজুরের গুড় তৈরির জন্য একত্রিত করতো। সকাল থেকে দিনের অর্ধবেলা পর্যন্ত মা-বোনেরা বড় কড়াইতে করে রস থেকে গুড় বা মিঠাই তৈরী করতো।

আবার অনেক গাছি কুয়াশার ভিতরে গ্রামের পথ ধরে কাঁধে রসের ভার বহন করে হেঁটে চলতো রস বিক্রির আশায়। দিনের বেলায় পাখিরা রসের চুঙ্গিতে বসে মনের সুখে রস খেয়ে উড়ে যেতো। মৌমাছিরাও রসের আশায় ভোঁ ভোঁ করে উড়ে বেড়াতো। সে দৃশ্য দেখে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যেতো সবার।

প্রতি বাড়িতে সকাল বেলা খেজুর রসের ফিন্নি-পায়েস তৈরী হতো। পরিবারের সবাই খুব মজা করে সেই ফিন্নি-পায়েস খেতো। পৌষ মাসে যখন তীব্র শীত পড়তো অনেকে তখন রাতের বেলায় রস নিয়ে রাতেই পায়েস রান্না করতো।

খেজুরের গুড়ের কদর ছিলো প্রায় সবার কাছেই। মুড়ি থেকে মোয়া তৈরীর প্রধান উপাদান ছিলো এই খেজুরের গুড়। গ্রামের সকল হাট-বাজারগুলোতে প্রচুর পরিমাণ খেজুরের গুড় পাওয়া যেতো। কিন্তু সময়ের টানে আজ বাঙালীর সেই ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ নেই; নেই খেজুরের রস এবং খেজুরের মিঠাই নামের কোনো গুড়ও। এখন বাজারে উঠে না খেজুরের রস। নেই প্রতি বাড়িতে সকাল বেলা ফিন্নি তৈরির কোনো উৎসব-আনন্দ। তখনকার দিনে গ্রামের দুষ্ট ছেলেরা গভীর রাতে রস চুরি করে পিন্নি পায়েস তৈরী করে রাত জেগে আনন্দ পূর্তি করত। তা এখন আর চোখে পড়ে না।

বাংলার ঐতিহ্যের সূচী থেকে এভাবে লোভনীয় বস্তুটি এত দ্রুত হারিয়ে যাবে কেউই তা মানতে নারাজ। লক্ষ্মীপুর জেলা এক সময় এ ঐতিহ্যবাহী খেজুর রসের জন্য বিখ্যাত হলেও এখন তা আর নেই। কার্তিক শেষে পৌষ চলতে লাগলো কিন্তু কোথাও কোনো খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের অয়োজন চোখে পড়ে না। রাস্তার পাশে কিংবা বাড়ির আড়ায় কেউ খেজুর গাছ রোপন করছে না। এটি এখন দুর্লভ বস্তু হিসেবে পরিণত হয়েছে। জেলার সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতিসহ সকল উপজেলার তথ্যচিত্র প্রায় একই রকম।

এ সম্পর্কে রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার গ্রামের এক সময়কার নামকরা গাছি মন্তাজ মিয়া (৬১) বলেন, ‘এখন শীতের সময় খেজুর রস নেইÑএটা বিশ্বাস করতে পারছি না। জীবনে খেজুর গাছ কাটার পিছনে অনেক সময় ব্যয় করেছি। তবে আলেকজান্ডার ইউনিয়নের চর আবদুল্যাহ থাকলেও কিছু খেজুর গাছ দেখতে পেতাম। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য তাও মেঘনার করাল গ্রাসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন সদর আলেকজান্ডার বাজারও ভেঙে যাওয়ার পথে। বাংলার এতিহ্য বিশ্বাস করেন এমন সচেতন মহল জানান, আমাদের এ সকল ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে এবং এটা আমাদের সবার স্বার্থেই।

কমলনগর উপজেলার তালতলী এলাকার পল্লী চিকিৎসক ফয়েজ উল্যাহ (৬০) বলেন, ‘আগে আমাদের গ্রামের রস নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলা শহরে যেতো। কিন্তু এখন আমরাই রস পাই না। আর ছোট বাচ্চারাতো রস চিনেই না।’

কমলনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, খেজুর গাছ পেতে হলে সবার আগে খেজুর গাছ সংরণ করতে হবে। এখন গ্রামে কেউ আর খেজুর গাছ রোপন করতে চায় না। এজন্যই ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস কিংবা খেজুর গুড় পেতে হলে প্রতি বছর বৃরোপনের সময় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে খেজুর গাছ রোপনের উপর জোর দিতে হবে। নতুবা চিরতরে হারিয়ে যাবে আমাদের বাঙালীর ঐতিহ্য খেজুরের রস।

Print Friendly, PDF & Email
Spread the love



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *